কভিড ১৯ সংকট মোকাবেলা ! কি কি করবেন।
★লকডাউন যদি উঠে যায় এবং আমাদেরকে বাইরে চলাফেরা করতে হয় তখনও কি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে?
-----অবশ্যই থাকতে পারে, যতদিন না কনফার্মড বা নিশ্চিত হওয়া যাবে নতুন করে কারুর করোনা ভাইরাল ডিজিজ হচ্ছে না, ততদিন এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই, কারণ দেশের সব মানুষকে ধরে ধরে তার করোনা ভাইরাস আছে কি না---- তা চেক করা হচ্ছে না ; যেটা করা হয়েছে উত্তর কোরিয়ায়। উত্তর কোরিয়ায় কোন লক-ডাউন করা হয়নি, সারা দেশে একদিনেই কারুর শরীরে করোনা ভাইরাস আছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়েছে, এবং যে কয়জনের শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে তাদের হসপিটালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়েছে। কিন্তু সেটা অল্প সংখ্যক লোকের দেশ বলেই সম্ভব হয়েছে । আমাদের মতন এই বিশাল দেশে তা সম্ভব নয়।
★ তাহলে লকডাউন উঠে গেলেও যদি বাইরে বেরুতে হয়, কিভাবে চলাফেরা করবো বা কাজকর্ম করবো, বা কি ধরণের সাবধানতা অবলম্বন করবো?
----অতি সাবধানতার সাথে চলাফেরা করতে হবে , বা কাজকর্ম করতে হবে।
যে সব নিয়মগুলি অবশ্যই পালনীয় তা জানাচছি ---
১) সব সময় 3-4 ফুট দূর থেকে মানুষের সাথে লেন-দেন করার, বা কথাবার্তা বলার চেষ্টা করতে হবে,
২) হঠাৎ হঠাৎ নাকে, মুখে, বা চোখে হাত দেওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে ,
৩) বাইরে ঘোরা বা কাজকর্ম করা যেতে পারে, কিন্তু পকেটে একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল অবশ্যই রাখতে হবে, এবং কোথাও কোন জিনিসের সাথে ডাইরেক্ট কন্টাক্ট হলে পকেট থেকে স্যানিটাইজারের বোতলটা বের করে হাত দুটি ওয়াশ করতে হবে, অর্থাৎ ধুয়ে ফেলতে হবে।
কোলাপসিবল গেটের, বাসের বা ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরলে, ফ্লাট বাড়ীর কমন তালা খুললে বা লাগালে, ইত্যাদির পরে পকেট থেকে বা ব্যাগ থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বের করে দুইটি হাতের সামনে পিছনে ভালো করে মুছে নিতে হবে। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের গায়ের লেখা দেখতে হবে ----কমপক্ষে 60 পার্সেন্ট এ্যালকোহল থাকতে হবে । আমি বর্তমানে একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করছি -- তাতে ৭০% এ্যালকোহল আছে, নীচে ছবি দিলাম, দেখে নেবেন।
৪) যেখানে প্রচুর লোক সমাগম হবে, যাকে বলা হয় মাস গ্যাদারিং, সে সব জায়গা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে।
৫) মাস্ক ব্যবহার করলে, বাইরে থেকে বাড়ীতে এসে কাপড় কাচা ক্ষার সাবান বা কার্বলিক এ্যাসিড সাবান যেমন-- লাইফ বয় সাবান দিয়ে ধুয়ে রোদে দিতে হবে ,
★ করোনা ভাইরাস ডিজিজ হওয়া মানেই কি অবধারিত মৃত্যু?
---- না মোটেই তা নয় ,
হাম, পকস, চিকোনগুনিয়া , ডেঙ্গু, প্রভৃতি রোগের মত এটিও একটি ছোঁয়াচে জীবানুঘটিত রোগ। পার্থক্য এটাই----এই ভাইরাস অতি দ্রুত বংশ বিস্তার করে, এবং ভাইরাসগুলি অতি তাড়াতাড়ি ফুসফুসে চলে যায় এবং ফুসফুস নষ্ট করতে থাকে। তবে ঠিকমতন চিকিৎসা হলে বহু রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরে যাচ্ছেন তা সবাই খবরে পড়ছেন এবং দেখছেন।
আগেই বলেছিলাম-- কার শরীরে এই ভাইরাসটা কতটা এফেক্ট করবে, তা নির্ভর করবে একজনের শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বা ইমিউনিটির উপরে।
সাধারণত বাচ্চাদের এবং বৃদ্ধদের শরীরে ইমিউনিটি কম থাকে। কিন্তু করোনা ভাইরাস দেখা যাচ্ছে ৫০ উর্ধো বয়স্কদের বা বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে আরোগ্যলাভে বেশী বাধার সৃষ্টি করছে।
স্ট্যাটিস্টিকস বলছে যাদের আগের থেকে ডায়াবেটিস ছিল, হাইপারটেনশন বা বেশী ব্লাড প্রেসার ছিল, শ্বাসকষ্ট ছিল, বা রিনাল ফেলিওর ছিল --- ডায়ালেসিস চলতো, বা ক্যান্সারে, বা অন্য কোন বড় অসুখে ভুগছিল, তাদের করোনা ভাইরাস অ্যাটাক করলে মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশী।
কারণ -- অনেকদিন ধরে অসুখে ভুগে এবং নানারকম ঔষধ খেয়ে তাদের শরীরের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে গেছে, তাদের জীবনীশক্তি খুবই দুর্বল হয়ে আছে, কিম্বা যারা প্রচুর পরিমাণে এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ খেয়ে এসেছে, ফলে শরীরটা ড্রাগ রেসিসট্যান্স হয়ে আছে, অন্য কোন ঔষধ চট করে ধরতে চাইছে না, তাদের করোনা ভাইরাস আক্রমনে মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশী।
★ বাইরে কিভাবে চলতে হবে বললেন, বাড়ীতে কিভাবে।
১) ঘরের দরজা জানালা বন্ধ রাখা যাবে না, জানালা খোলা রাখতে হবে, ঘরে যেন বিশুদ্ধ হাওয়া প্রবাহিত হতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে । যে ঘরে প্রতিনিয়ত ফ্রেস অক্সিজেন ঢুকবে আর কার্বন ডাই অক্সাইড বেরিয়ে যাবে, আরও সোনায় সোহাগা হবে সকালে বা বিকালে যদি একটু সূর্যের আলো বা তাপ ঢুকতে পারে, সেই ঘরে রোগ জীবানু কম বাসা বাঁধতে পারে,
কোন ঘরে যদি ক্রশ ভেন্টিলেশন থাকে তবে তা আরও ভাল ও স্বাস্থ্যসম্মত ঘর হতে পারে।
ক্রশ ভেন্টিলেশন কি জিনিস?
ক্রশ ভেন্টিলেশন হচ্ছে অপোজিট ডাইরেকশনে যদি জানালা রাখা যায়, যেমন-- ঘরের দক্ষিন দিকের দেয়ালের যে পজিসনে জানালা, উত্তর দিকের দেয়ালে সেই একই পজিসনে জানালা রাখলে বা থাকলে, ফ্রেস অক্সিজিনেটেড হাওয়া একদিকের জানালা দিয়ে ঢুকে, ঘরের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে, অন্যদিকের জানালা দিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইডযুক্ত হাওয়া বের করে দেবে।
অনেকে যারা দেশলাই খাপের মতন দুই রুমের ফ্লাট বাড়ীতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের এসব শুনে দুঃখের হাসি পাবে, মনে মনে বলবে---- মশাই, একটা জানালা ছিল তাও ফ্রিজ, আলমারী রাখতে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেল, আপনি আবার ক্রশ ভেন্টিলেশন বলছেন!
২) এসি মেশিন থাকলে তা বন্ধ রাখতে হবে, এসি চালানো ঘরে ভাইরাসরা বেশী দিন বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকতে পারে। কারন, ঘর সব সময় বদ্ধ থাকে, আর বদ্ধ ঘরে সব সময় রোগ-জীবাণু বৃদ্ধির প্রবণতাও বেশী থাকে।
এসি প্রীতি আমাদের আধুনিক সভ্যতার একটি অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সত্যি কথা বলতে কি---এসি ঘরে ঘন্টার পর ঘন্টা থাকার জন্য অনেক বাচ্চা ও বৃদ্ধদের সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, সারা বছর লেগেই থাকে, অন্য রোগ জীবানুও বৃদ্ধি পায়।
আসলে ---সভ্যতার খাতিরে, ভদ্রতার খাতিরে, সামাজিকতার খাতিরে, পারিপার্শ্বিকতার খাতিরে আমরা আজ এমন অনেক কিছু করতে বাধ্য হচ্ছি, যা পরে আমাদেরকে সহজে ছেড়ে দিচ্ছে না,
৩) ঘরে কার্পেট না থেকে যদি প্লেন মেঝে হয় এবং রোজ জল, কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করা যায়, তাতে রোগ জীবানু কম বাসা বাঁধতে পারে, ফলে ঘর বাড়ী স্বাস্থ্য সম্পন্ন হয়,
৪) অনেক লোকে বাড়ীতে আসতে চাইলেও যেভাবেই হোক এ্যাভয়েড করতে হবে, নিতান্তই কেউ আসলে দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলতে হবে, এবং সে চলে গেলে তার বসার জায়গা বা তার ধরার জিনিস ডিসইনফেকট্যান্ট করতে হবে,
৫) বদ্ধ ঘরে ধূপ জ্বালিয়ে বসে থাকা চলবে না, এটা খুবই ক্ষতিকর ব্যাপার, স্বাস্থ্যের পক্ষে বিশাল ক্ষতিকর, এই বিষাক্ত ধোঁয়া বদ্ধ ঘর থেকে বেরুতে না পেরে শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে ফুসফুসের অনিষ্ট করে, ফুসফুসকে দূর্বল করে দেয়, বহু ফুসফুসের বা গলার ক্যান্সার এই রকম বদ্ধ ঘরে ধূপ জ্বালিয়ে তার মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে সৃষ্টি হয়েছে, এমন উদাহরণ আছে,
★ সর্দি, কাশি, জ্বর থাকলে পরীক্ষার জন্য তাকে নিয়ে যে কোয়ারেনটাইন সেন্টারে রাখছে শুনছি, ব্যাপারটা কি?
-কোয়ারেনটাইন মানে হচ্ছে, কাউকে যে রোগের জন্য সন্দেহ বা সাসপেক্ট করা হচ্ছে, তাকে সেই রোগের ইনকিউবেশন পিরিয়ড পর্যন্ত আলাদা জায়গায় রেখে অপেক্ষা করা এবং দেখা --- রোগের লক্ষনগুলি সত্যিই ফুটে বেরুচ্ছে কি না,সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো--- আজ যে ইটালীতে করোনার মৃত্যু মিছিল সব থেকে বেশী, কোয়ারেনটাইন শব্দটি কিন্তু সেই ইটালীর কোয়ারেন্টো শব্দ থেকে এসেছে। কোয়ারেন্টো শব্দের অর্থ হচ্ছে চল্লিশ,
চৌদ্দ শতকে ইতালির বাণিজ্য জাহাজগুলি বাইরে থেকে তাদের ভেনিস বন্দরে আসলে দেখা যেত আরোহীরা অনেকেই এক অজানা রোগে আক্রান্ত হতো, (প্লেগ রোগে) , কিন্তু অনেকের তীরে নামার সময় কোন রোগ লক্ষন দেখা যেত না,
পরে সিমপটমস প্রকাশ পেত।
( কারন তখন তারা রোগটির ইনকিউবেশন পিরিয়ডে থাকতো) । তাই নগর কতৃপক্ষ ঠিক করে দিয়েছিল যে কোন জাহাজ বাইরে থেকে আসলে তাকে পাশের কোন দ্বীপে, বা সমুদ্রের মাঝখানে 40 দিন ( কোয়ারেন্টো), নোঙর করে থাকতে হবে, তারপর আরোহীরা জাহাজ থেকে অবতরণ করবে।
ব্যাস, তখন থেকেই চালু হল কোয়ারেন্টো, এবং পরে কোয়ারেন্টাইন শব্দ, অর্থাত আলাদাকরণ।
বর্তমানে প্রতিটি রোগের ইনকিউবেশন পিরিয়ড জানা গেছে, তাই চৌদ্দশ সালের মতন আন্দাজে আজকাল ৪০ দিন কাউকে আটকে রাখা হয় না, যে রোগের যে কয় দিন ইনকিউবেশন পিরিয়ড, সেই দিন পর্যন্ত আলাদা রেখে দেখা হয় সেই রোগটির সিমপটমস ফুটে উঠছে কি না, অবশ্য তার সাথে অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষাও চলতে থাকে ।
★ কোয়ারেন্টাইন আর আইসোলেশন শব্দ দুটি কি এক?
----- মোটামুটি ভাবে বলা যেতে পারে এক, কোয়ারেনটাইনে রাখা মানে আলাদা রাখা হয় হাসপাতাল কতৃপক্ষ দ্বারা, বা সরকারী নির্দেশনাসারে, কিন্তু আইলোসেন মানে আলাদা রাখা হয়, বা থাকা হয় যে কোন জায়গায়, এমনকি, নিজের বাড়ীতেও থাকা ।
★ আমার যদি জ্বর সর্দি-কাশি ইত্যাদি চলে, পরীক্ষা হয় নি, তবু যদি মনে করি--- আমার শরীরের মধ্যে করোনা ভাইরাস থাকতে পারে , তবে আমার থেকে যেন আরও দশটা মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস না ছড়ায়, তার জন্য আমি কি কি সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি ?
---- আপনি যদি মনে করেন আপনার শরীরে এই ভাইরাস থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু যাতে অন্যদের মধ্যে আপনার থেকে রোগটি না ছড়ায় তার জন্য আপনাকে করতে হবে ----
১) কারুর সাথে হ্যান্ডশেক করবেন না ,
২) কাশবার সময় যে কোন হাতের বাহুর সামনে মুখ রেখে কাশবেন, যাতে ভাইরাসরা বেশীদূর ছড়াতে না পারে, কি ভাবে কাশতে হবে---
লেখার নীচে একটা ছবি দিলাম দেখে নেবেন,
৩) বাড়িতে আলাদা ঘরে আইলোসনে থাকবেন,
৪) যেখানে সেখানে থুথু বা কফ ফেলবেন না,
৫) জনসমাগম, বা জনবহুল জায়গায় যাবেন না,
৬) সব সময় মাস্ক ব্যবহার করবেন,
কারণ এই ভাইরাস যেন বেশী মানুষের মধ্যে না ছড়ায়, তা আটকানোর প্রধান টেকনিকটা হলো-----
কাটিং ডাউন দ্য চেইন অব ট্রান্সমিশন,
সেই নিয়মটা আপনাকে পালন করার চেষ্টা করতে হবে।
Comments
Post a Comment